একজন Self-Taught ডেভেলপারের অম্লমধুর জার্নি

২০০৭ থেকে ২০২৬—দেখতে দেখতে প্রায় দুই দশক। পেছনে তাকালে মাঝে মাঝে নিজেকেই নিজে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। আজকে যখন চারদিকে রিসোর্সের বন্যা, এআই (AI) আমাদের হাতের মুঠোয়, তখন মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলোর কথা, যখন একটা তথ্যের জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। আমার এই দীর্ঘ পথচলাটা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা সুশৃঙ্খল ট্রেনিংয়ের গল্প নয়; এটা স্রেফ জেদ, কৌতুহল আর টিকে থাকার এক কঠিন যুদ্ধ।

শুরুর গল্প: বাটন ফোনের স্ক্রিন থেকে কোডিংয়ের দুনিয়ায়

তখন ২০০৭ সাল। চারদিকে জাভা বা সিম্বিয়ান ফোনের যুগ। ছোট একটা মোবাইল স্ক্রিনে বিভিন্ন সাইট ব্রাউজ করে যখন রিংটোন আর ওয়ালপেপার ডাউনলোড করতাম, হঠাৎ মাথায় একটা ভূত চাপলো—আচ্ছা, এই সাইটগুলো মানুষ বানায় কীভাবে? তখন না ছিল গাইড করার মতো কেউ, না ছিল কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধারণা।

হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে একদিন একটা ফ্রি মোবাইল সাইট বিল্ডারের সন্ধান পেলাম। সেখান থেকেই জীবনের প্রথম HTML-এর সাথে পরিচয়। মোবাইল স্ক্রিনেই কোড লিখে সাইট বানালাম, আস্তে আস্তে বুঝলাম CSS-এর জাদু। কোনো মেন্টর নেই, শেখার মতো কোনো কমিউনিটি নেই; স্রেফ শখ আর তীব্র কৌতুহলকে পুঁজি করে ভাঙা ভাঙা পায়ে এগিয়ে চলা।

ওয়ার্ডপ্রেস, পিএইচপি এবং প্রথম প্লাগইন

২০১০ সালে এসে পরিচয় হলো ওয়ার্ডপ্রেসের সাথে। আর এই ওয়ার্ডপ্রেসের হাত ধরেই ব্যাক-এন্ডের দুনিয়ায় পা রাখা, পরিচয় হওয়া PHP-এর সাথে। দীর্ঘ দুই বছরের চেষ্টায় ২০১২ সালে প্রথম একটা নিজস্ব প্লাগইন বানিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত করলাম। তবে সত্যি বলতে, তখন পর্যাপ্ত গাইডলাইন এবং অ্যাডভান্সড রিসোর্সের এত অভাব ছিল যে, যতটুকু সম্ভাবনা নিয়ে আমি এগোতে পারতাম, ঠিক ততদূর যাওয়া হয়নি।

২০১৬-২০১৭: ফ্রিল্যান্সিং থেকে সরাসরি রিমোট জব

বাঁক বদলটা হলো ২০১৬ সালে। সেই স্বল্প আর ভাঙাচোরা অভিজ্ঞতার আলোকেই হঠাত একটা ফ্রিল্যান্সিংয়ের সুযোগ পেয়ে গেলাম, তাও আবার সরাসরি বিদেশী ক্লায়েন্টের সাথে। এর ঠিক পরের বছর, ২০১৭ সালে পেয়ে গেলাম একটি ফুল-টাইম রিমোট জব।

কিন্তু এটাই কি সাফল্যের শেষ? না, আসল যুদ্ধটা তো মাত্র শুরু হলো! একদিকে নিজের অভিজ্ঞতার প্রচণ্ড ঘাটতি, অন্যদিকে প্রতিদিন ক্লায়েন্ট বা বসের টেবিলে হাজির হওয়া নিত্যনতুন জটিল সব টেকনিক্যাল সমস্যা। এত দ্রুত নতুন জিনিস শিখতে হচ্ছিল এবং তখনই সেটা প্রোডাকশনে অ্যাপ্লাই করতে হচ্ছিল যে, মাঝে মাঝে মাথা কাজ করত না। চরম দিশেহারা আর হতাশ লাগতো, কিন্তু ‘হাল ছেড়ে দেওয়া’র অপশন আমার ডিকশনারিতে ছিল না।

নতুন চ্যালেঞ্জ: মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট

২০১৭ সালেই হঠাৎ বসের নির্দেশ—মোবাইল অ্যাপ বানাতে হবে। আমার তখন অ্যাপ ডেভেলপমেন্টের ‘অ’-ও জানা নেই। কোনো সিনিয়র ডেভেলপার নেই পাশে, নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ট্রেনিং। দিনরাত এক করে গুগলে সার্চ করা, স্ট্যাক ওভারফ্লো বা বিভিন্ন ফোরাম আর ব্লগ সাইট ঘাঁটাঘাঁটি করা—এটাই ছিল আমার রুটিন। একদিকে নিজে শিখছি, অন্যদিকে প্রতিদিন বসকে অ্যাপের প্রগ্রেস আপডেট দিচ্ছি।

ঐ বছরই একই সাথে অ্যান্ড্রয়েড এবং আইওএস (iOS) অ্যাপ তৈরি করা শুরু করলাম নেটিভ সিস্টেমে (Java এবং Swift দিয়ে)। মাত্রই একটু গুছিয়ে উঠছি, ঠিক পরের বছরই (২০১৮) চারদিকে ‘ফ্লাটার’ (Flutter) নিয়ে তুমুল হাইপ শুরু হলো। ওদিকে iOS-এ সুইফটের পরিবর্তে ‘সুইফট ইউআই’ (SwiftUI) নিয়ে মাতামাতি। নিজের শেখা সিস্টেমটা দাঁড় করানোর আগেই টেকনোলজির এই দ্রুত পরিবর্তন দেখে আরও দিশেহারা লেগেছিল। কিন্তু আমি নিজের সিদ্ধান্তে স্থির থাকলাম—যেটা শুরু করেছি, আগে সেটাতেই শক্ত ভিত গড়বো।

টেকনোলজির সমুদ্র এবং একা একাই টিকে থাকা

যখন নিজের PHP স্কিল আরও মজবুত করতে চাচ্ছিলাম, তখনই চোখের সামনে একের পর এক ধেয়ে আসতে লাগলো লারাভেল, নোড জেএস, রিয়্যাক্ট জেএসের মতো ফ্রেমওয়ার্কের জোয়ার। মনে হতো অথৈ সাগরে পড়েছি, কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছি না। কিন্তু আমি আমার জায়গায় স্থির থাকলাম। কারণ আমি জানতাম, এই মুহূর্তে যেটা দিয়ে আমার কাজ চলছে এবং ডাল-ভাত জুটছে, সেটা আগে নিখুঁতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

ধীরে ধীরে সময় বদলালো। ইন্টারনেটে প্রচুর রিসোর্স আসতে শুরু করলো। শেখাটা আগের চেয়ে অনেক সহজ হলো, ফলে মাথার ওপর থেকে মানসিক প্রেসারটাও কমলো। জটিল সব সমস্যার সমাধান এখন আগের চেয়ে দ্রুত করতে পারি। তবে এই দীর্ঘ সময়ে আমার একটা নিয়ম কখনো বদলায়নি—কখনো কোনো সমস্যা সমাধান না করে আমি কাজ থামাইনি। আর আজ তো এআই (AI) এসে সবকিছু আরও সহজ করে দিয়েছে, মনে হয় পুরো টেক দুনিয়াটাই এখন হাতের মুঠোয়!

৩৬৫ দিনের যুদ্ধ এবং ছুটির গুরুত্ব

কাজের চাপ আমার কখনোই কমেনি। ২০১৭ সালে রিমোট জবে ঢোকার পর থেকে টানা সাড়ে তিন বছর আমি কোনো সাপ্তাহিক ছুটি ছাড়া কাজ করেছি। ভাবা যায়? ৩৬৫ দিনই কোডিং, ক্লায়েন্ট হ্যান্ডলিং আর প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট! এই তীব্র প্রেসার, মানসিক টেনশন আর দিনরাতের একঘেয়েমি আমার ব্যক্তিগত জীবনকে প্রায় পিষে ফেলছিল। বুঝতে পারলাম, নূন্যতম ছুটি না পেলে আমার পক্ষে কাজ করা অসম্ভব হয়ে দাড়াবে। অবশেষে ২০২১ সালে আমি আমার বসকে বুঝিয়ে বললাম এবং সপ্তাহে অন্তত ১ দিন ছুটির দাবি জানালাম। ২০২১ সাল থেকে পাওয়া সপ্তাহে সেই ১টি দিনের ছুটি আমার জীবনে মরুভূমিতে মেঘের মতো স্বস্তি এনে দিয়েছিল। এই ছুটির কিছুটা সময় আমার স্কিল ডেভেলপমেন্টেও সাহায্য করেছে।

ফুল-স্ট্যাকের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ‘এক্সপার্টাইজ’

একজন রিমোট ডেভেলপার হিসেবে যেকোনো প্রজেক্টের প্ল্যানিং, আর্কিটেকচার থেকে শুরু করে কোডিং এবং ডেপ্লয়মেন্ট —সবকিছুই আমাকে একা করতে হয়। এর একটা বড় সুবিধা হলো, টেকনোলজির অনেক বিশাল একটা ক্ষেত্র নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে। কিন্তু এর একটা অন্ধকার দিকও আছে। এত বেশি বিষয়ে একসাথে কাজ করতে হয় যে, মাঝে মাঝে মনে হয় নির্দিষ্ট কোনো একটা সিঙ্গেল বিষয়ে হয়তো আমি কখনোই শতভাগ ‘এক্সপার্ট’ হতে পারবো না। ‘জ্যাক অব অল ট্রেডস, মাস্টার অব নান’ হওয়ার একটা প্রচ্ছন্ন আফসোস থেকেই যায়।

শেষ কথা: প্রতিষ্ঠান প্রধানদের প্রতি একটি প্রশ্ন

টেকনোলজি এত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে যে, সব রিসোর্স থাকার পরও চ্যালেঞ্জ প্রতিদিন বাড়ছে। কিন্তু নিজের মতো করে স্কিল ইমপ্রুভ করার জন্য যে একটা শান্ত, নিরিবিলি সময় দরকার—সেটা অনেকে কখনোই পায় না। এই জিনিসটা তাকে প্রতিনিয়ত হতাশ করে। যেসব সফটওয়্যার ডেভেলপাররা কর্পোরেট বা ভালো প্রতিষ্ঠানে ২ দিন সাপ্তাহিক ছুটি আর বছরে পর্যাপ্ত পেইড লিভ পান, তারা হয়তো নিজেদের মতো করে কিছু সময় কাটাতে পারেন, নতুন কিছু শেখার সুযোগ পান। কিন্তু আমাদের মতো রিমোট বা স্বাধীন ফিল্ডের সবাইকে তো সেই সুবিধা সমাজ বা প্রতিষ্ঠান দেয় না।

তাই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, একজন মানুষের জীবনে ‘ছুটি’র গুরুত্ব অপরিসীম। যেসব প্রতিষ্ঠান প্রধানরা মনে করেন কর্মীদের ছুটি না দিয়ে বছরে ৩৬৫ দিন খাটিয়ে নিতে পারলেই প্রতিষ্ঠানের লাভ—তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আপনারা কি আসলেই সঠিক কাজ করছেন? একজন ক্লান্ত, অবসাদগ্রস্ত এবং রোবট হয়ে যাওয়া ডেভেলপার কখনো আপনাকে সেরা আউটপুট দিতে পারে না, আর ছুটি না পেয়ে কাজে ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা তো আছেই। তাই ক্রিয়েটিভিটির জন্য বিশ্রামের প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

আপনার কী মত? একজন ডেভেলপারের প্রডাক্টিভিটি বাড়াতে সাপ্তাহিক ছুটি এবং মেন্টাল ব্রেকের ভূমিকা কতটা? কমেন্টে আপনার অভিজ্ঞতা জানান।

One thought on “একজন Self-Taught ডেভেলপারের অম্লমধুর জার্নি”

  1. আপনার লেখা পড়ে খুবই ভালো লাগলো। সময়ের সাথে প্রতিযোগিতা করে, সফলতার একজন ব্যক্তি হিসেবে দেখলাম।

    ১. মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে — দীর্ঘ সময় কোডিং করলে মানসিক ক্লান্তি জমে।
    ২. বাগ ও ভুল কমে — বিশ্রামের পর সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাড়ে।
    ৩. সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পায় — নতুন আইডিয়া ও ভালো সমাধান খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।
    ৪. বার্নআউট প্রতিরোধ করে — অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি কমে।
    ৫. দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়ে — কম সময়ে বেশি কার্যকরভাবে কাজ করা যায়।
    ৬. ব্যক্তিগত কাজ সম্পাদন – পারিবারিক কিছু কাজ ছুটির সময় করতে পারলে, পরবর্তী কাজে ব্যাঘাত ঘটে না।
    ৭. ব্যক্তিগত স্কিল ডেভেলপমেন্ট – কাজের প্রেসার না থাকলে স্কিল ডেভেলপ করার সুযোগ থাকে।

    ধন্যবাদ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।